নাগরিক ঘোষণাপত্র ২০১৭

নাগরিক ঘোষণাপত্র ২০১৭

নাগরিক ঘোষণাপত্র ২০১৭

 

আমরা বাংলাদেশের নাগরিকগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক  প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ-এর আহ্বানে “নাগরিক সম্মেলন ২০১৭: বাংলাদেশে এসডিজি বাস্তবায়ন” শীর্ষক আজকের মিলনমেলায় একত্রিত হয়েছি। জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ২০৩০-এর ঘোষণাপত্রে উচ্চারিত অঙ্গীকার ‘কাউকে পেছনে রাখা যাবে না-এ প্রত্যয় নিয়ে আজ আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত শতাধিক বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সংগঠন  এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা শ্রেণি-পেশার সহস্রাধিক মানুষ।

 

আমরা এমডিজি-র অর্জনগুলোর উপর ভিত্তি করে এসডিজি অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। বিগত দশকগুলোতে সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু আইন ও তার প্রয়োগের অভাব, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি বিভিন্ন সামাজিক অনুশাসন ও বৈরী মনোভঙ্গীর কারণে দেশের সব মানুষ সমান সুযোগ পাচ্ছেন না। জাতীয় সাফল্যের অংশীদার হতে পারছেন না সংখ্যা গরিষ্ঠ নাগরিক।  তাই বৈষম্য কমেনি, বরঞ্চ বিপন্নতা বেড়েছে তাদের, যারা প্রান্তিক এবং সুবিধা বঞ্চিত। কিন্তু এসডিজি-র অঙ্গিকার- “কাউকে পেছনে রাখা যাবে না”। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

 

এটা দৃশ্যমান যে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বিরাজমান থাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অর্জনে প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানাভাবে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর পরিধি বাড়ছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার অভাব, স্বাস্থ্য সেবার অপ্রতুলতা, ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ, প্রতিকূল ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বিপন্নতা, জীবনচক্রে অবস্থান, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতা, জেন্ডার ও তৃতীয় লিঙ্গ বৈষম্য, নাগরিক পরিচয়ের সংকট এবং আইনের শাসনের অভাব – সমাজের  বিভিন্নমুখী বিপন্নতাকে প্রতিনিয়ত ব্যাপকতর করছে। আবার কোনও কোনও জনগোষ্ঠী একই সাথে একাধিক বিপন্নতায় আক্রান্ত। দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ শিশু পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা ও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, প্রায়শই তারা সহিংসতায় আক্রান্ত।  যুব সমাজকেও বিপন্নতা গ্রাস করছে তাদের কর্মের সুযোগ না থাকায়, ফলে দেখা দিচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। প্রতিকূল পরিবেশ সার্বিক বিপন্নতাকে আরও গভীরতর করছে। বিপন্নতা ও বঞ্চনার এ বহুমাত্রিক বাস্তবতার আশু অবসানের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

স্মর্তব্য যে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিগত দশকগুলোতে নাগরিক সমাজ উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। নাগরিক সমাজের এ ভূমিকা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে এবং আগামীতে তা আরও জোরদার করতে হবে। এ সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশ সম্পর্কিত সমস্যাদি ও সুশাসনের অভাবজনিত বৈষম্য দূরীকরণে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উঠে এসেছে। আমরা মনে করি এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে আমরা নিজেরা যেমন সচেষ্ট ও সক্রিয় থাকব, তেমনি সে সবের কার্যকরী বাস্তবায়নে আমরা সরকারের প্রচেষ্টারও অংশীদার হতে চাই।

 

এ সম্মেলন থেকে আমরা নিম্নলিখিত দাবিসমূহ উত্থাপন করছি যার মাধ্যমে আমরা একটি ন্যায় ও অধিকার ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ব যেখানে কাউকে পেছনে রাখা যাবে না। আমাদের কর্মকাণ্ডে আমরা এ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করব, মানুষকে সচেতন করব, তাঁদের স্বক্ষমতা বাড়াব। আমাদের প্ল্যাটফর্ম এসব উদ্যোগ সমন্বয়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।

 

আমরা দৃঢ় ভাবে প্রত্যাশা করি যেঃ

 

১.  বাংলাদেশের প্রান্তিক, সুবিধা বঞ্চিত ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নে সম্পৃক্ত করে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত পদেক্ষেপ নিতে হবেঃ

ক. যথাযথ নীতি-কাঠামো প্রণয়ন এবং তার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ

খ. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারী পরিকল্পনা ও আইনের পুর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন

গ. নীতি-কাঠামো প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট নাগরিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি

ঘ. কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে স্বচ্ছ এবং প্রাধিকারপূর্ণ অর্থ বরাদ্দ

২.  প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থে প্রণীত কর্মপরিকল্পনা সরকারী-বেসরকারী যৌথ অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজনঃ

ক. যৌথ অংশিদারিত্বের নীতি প্রণয়ন

খ. কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিতকরণ

গ. বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ এবং পরিবীক্ষণ এবং এ কার্যক্রমে নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ

৩. টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূচকের প্রেক্ষিতে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর অবস্থান নির্নয়ে প্রয়োজনীয় বিভাজিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।

৪.  প্রান্তিক, সুবিধা বঞ্চিত ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষা তথা আইনের শাসন কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সকল বৈষম্যমূলক আইন সংস্কার করতে হবে।

৫.  জনগণের প্রত্যাশার নিরিখে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে খসড়া ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ জাতীয় সংসদে অনুমোদন দিতে হবে।

৬.  পার্বত্য শান্তি চুক্তি এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইন দ্রুত ও পুর্নাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

৭.  নারী সহ সকল নাগরিকের সম্পদ ও আয়ের উপর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৮.  যুব সমাজের কর্মসংস্থানের জন্য লক্ষ্যমাত্রানির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার আশু বাস্তবায়ন করতে হবে।

৯.  সরকারি/খাস জমি ও অন্যান্য সম্পত্তিতে প্রান্তিক, সুবিধা বঞ্চিত ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে প্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে।

১০.  সমাজের বিপন্ন জনগোষ্ঠীর স্বার্থে প্রণীত বিশেষ আইন/নীতিসমূহ, যেমন বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধিত) আইন, ২০১৩; প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০, জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১, জাতীয় শিশুশ্রম নির্মূল নীতি ২০১০, উপকূলীয় অঞ্চল নীতি ২০০৫, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০১০-১৫, এবং বাদ পড়া সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোকে তালিকাভুক্তিকরণের মাধ্যমে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।।

১১.  গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথ্যে সকলের অধিকার নিশ্চিত করে নাগরিক সমাজের জন্য মুক্ত চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

১২.  আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে প্রান্তিক, সুবিধা বঞ্চিত ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর উনয়নের লক্ষ্যে অঙ্গীকার ও সেগুলোর  বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।

 

বদলে যাবে বাংলাদেশ। আমরা সবাই মিলে এমন এক বাংলাদেশ গড়ব যেখানে কেউ পেছনে পড়ে  থাকবে না, জাতীয় উন্নয়ন ও সাফল্য থেকে কোন নাগরিক বঞ্চিত থাকবেন না। আমাদের এ প্রত্যয়ের সফল বাস্তবায়নই হবে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নাগরিক সমাজের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ।